বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র অনলাইন বইপড়া কর্মসূচি

প্রতাপ নয় প্রেম বড়

chandan.paul
05:46 PM 21/06/2021
Rating : 10/10

ব‌ই পর্যালোচনা: বিসর্জন - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রকাশনা: বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র প্রচ্ছদ: ধ্রুব এষ মূল্য: একশত টাকা উনিশ শতকের মাঝামাঝি জন্মগ্রহণ করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তাঁর জীবন পর্যালোচনা করলে কোনো সাধারণ মানুষের সাথে মিল করা সম্ভব নয়। তাঁর চিন্তা চেতনা অতি মানবীয়। ১৮৯০ সালে লেখা বিসর্জন নাটকেও তাঁর অতিমানবীয় চিন্তার বহিঃপ্রকাশ ঘটতে দেখা যায়। নাটকের প্রত্যেকটি চরিত্র নিখুঁতভাবে নিজেকে প্রকাশ করেছে। চরিত্রগুলোর মধ্যে যেমন ভিন্নতা রয়েছে, তেমনি বাস্তব গুণাবলীসম্পন্ন। বিসর্জন নাটকের প্রধান বিষয় প্রেম আর প্রতাপের দ্বন্দ্ব। যুক্তিহীন শাস্ত্রাচার ও চিরাচরিত প্রথার সঙ্গে চিরন্তন মানব ধর্মের সংঘর্ষ পাঠক হৃদয়কে উজ্জ্বীবিত করে। নাটকের প্রতিটি সংলাপ খুবই অর্থপূর্ণ। পুরো নাটক পড়ার পরে আমার মনে হয়েছে, মানুষ তার পিতা-মাতা, ভাই-বোন, স্বামী-স্ত্রী, পরিবেশ-পরিস্থিতি, প্রকৃতির সাথে গভীর প্রেমের সম্পর্কে আবদ্ধ তা বেশ ভালোভাবেই ম্লান করে যুক্তিহীন শাস্ত্রাচার। একশ্রেণীর মানুষ তাদের প্রতাপ ধরে রাখতেই নিজের অন্তরের প্রেমকেই শুধু নষ্ট করছে না। তার আশেপাশের মানুষের হৃদয়ের প্রেমকেও খুব সুকৌশলে নষ্ট করছে। আর এই প্রক্রিয়াকে প্রতিষ্ঠা করার জন্য, মানুষের সামনে বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতেই পুঁজি করছে যুক্তিহীন শাস্ত্রাচার। কিন্তু মানুষের জীবনের জন্য কি প্রেম গুরুত্বপূর্ণ নাকি প্রতাপ গুরুত্বপূর্ণ? প্রতাপ যদি গুরুত্বপূর্ন হয় তাহলে প্রতাপ ধরে রাখতে মানুষ অবলীলায় তার প্রেম-ভালোবাসা, মনুষত্ব নষ্ট করছে। যে মানুষের মধ্যে প্রেম, ভালোবাসা, মনুষত্ব মানবিকতা না থাকে তাহলে তো সে মানুষ বলে গণ্য হয় না। যে মানুষের মাঝে মানবিক গুণাবলী না থাকে তবে তো সে হবে প্রতাপশালী পশু, মানুষ নয়। সে তখন অন্যদেরকে যেকোনো কিছু করতে প্ররোচনা করবে এটাই স্বাভাবিক। আর সেকারণেই রঘুপতি যেমন অপর্নার ছাগশিশু, রাজপালিত বালক ধ্রুব, এমনকি ত্রিপুরার রাজা গোবিন্দমাণিক্যের হত্যা বা হত্যার পরিকল্পনা করতে বিন্দুমাত্র ভাবেনি। এখানেই প্রমাণ হয় রঘুপতির প্রতাপ ধরে রাখতে হৃদয়ের ভালবাসার স্খলন ঘটেছে। কারণ যেখানে ভালোবাসা সেখানে রক্তপাত চলে না। আমরা অনেক সময় মনে করি কিছু পাওয়ার জন্য কিছু ত্যাগ করতে হয়। কিন্তু বিসর্জন নাটক পড়ার পরে আমার মনে হচ্ছে অনেক ক্ষেত্রেই এমন হতে পারে, যা পাওয়ার জন্য আমরা যা ত্যাগ করতে চাই তা হয়তো একই জিনিস। কিন্তু ত্যাগ করার সময় আমরা ভাবি না, আমরা কি জিনিস ত্যাগ করতে যাচ্ছি। তা আমার কাছে কতটা গুরুত্বপূর্ণ। হয়তো ত্যাগ না করলেও আমার পাওয়াটা সম্ভব হতে পারে, সেদিকেও ভেবে দেখি না। আবার এমনও হতে পারে সেই ত্যাগের সাথে আমার ওই না পাওয়া জিনিসের কোন সম্পর্ক‌ই নেই। ঠিক তেমনি রানী গুণবতী সন্তান লাভের জন্য বিশ্ব মাতার কাছে ছাগশিশু বলিদান করতে চান। তার প্রাণের মধ্যে আরেকটি প্রাণ অনুভব করার ইচ্ছায় ব্যাকুল হওয়ায় তিনি শুনতে পারেন না অসহায় প্রাণীদের প্রাণের ক্রন্দন। আর যখন কোন কিছু চলে যায় তখনই বোঝা যায় কি হারালাম। কিছু মানুষের হৃদয়ে শুধুমাত্র তখনই ভালোবাসার সঞ্চার হয়। ঠিক তেমনি অপর্ণা যেমন তার ছাগশিশু হারিয়ে পাগলপ্রায়, আর নাটকের শেষের দিকে রঘুপতি জয়সিংহ কে হারিয়ে বুঝতে পারল হৃদয়ে প্রেম কাকে বলে। আর সেই প্রেম গুরুত্বপূর্ণ নাকি তার সেই যুক্তিহীন শাস্ত্রাচার গুরুত্বপূর্ণ। বিসর্জন নাটকের গুরুত্বপূর্ণ একটি চরিত্র জয়সিংহ। এই চরিত্রের মাঝে আমি আমাকে যেন খুঁজে পেলাম। জয়সিংহের একটা কথা আমাকে ব্যাপকভাবে নাড়া দিয়েছে। তা হলো, " দেবতায় কোন্ আবশ্যক? কেন তারে ডেকে আনি আমাদের ছোটখাট সুখের সংসারে? তারা কি মোদের ব্যাথা বুঝে?পাষানের মতো, শুধু চেয়ে থাকে! আপন ভাইয়ের প্রেম হতে বঞ্চিত করিয়া, সেই প্রেম দিই তারে- সে কি তার কোন কাজে লাগে? তবে শেষ পর্যন্ত জয়সিংহের আত্মত্যাগের মাধ্যমে রাজপুরোহিত রঘুপতির যে চেতনার সঞ্চার ঘটে, তা পাঠক মনেও এক আশার সঞ্চার ঘটায়। পাঠক ভেবে স্বস্তি পায় যে, প্রতাপ বড় নয়, প্রেম বড়। আর বিশ্ব মাতার পূজা যুক্তিহীন শাস্ত্রাচার ও চিরাচরিত প্রথার দ্বারা নয়, বিশ্বমাতার পূজা প্রেমের দ্বারাই হয়।



সর্বমোট অ্যাপ ডাউনলোড
২৮৩০২
মোট নিবন্ধনকৃত ব্যবহারকারী
৩৪০৩১
সর্বমোট ডাউনলোড
২০০৪০৭৭
সর্বমোট ভিজিটর
১৫৭০৩৬৭